Sunday, May 15, 2016

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর | বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্কের ইতিহাস
ভাওয়াল গড়ের ছোট ছোট টিলা (চালা) নীচু ভূমি (বাইদ) সমৃদ্ধ শালবনে দেখা যেত আমলকি, বহেড়া, হরিতকী, করই, শিমূল, হলদু, পলাশ, চাপালিশ, কুসুম, পিতরাজ, উদাল এবং বিবিধ লতাগুল্মরাজি বনে দেখা যেত মায়া হরিণ, চিতাবাঘ, বন বিড়াল, গন্ধগকুল, শিয়াল, সজারু, অজগর, বানর, হনুমানসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি শালবনে প্রায় ৬৩ প্রজাতির গাছপালা ২২০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা যেত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন, বন ধ্বংস করে কৃষি জমির বিস্তার, আবাসন, জবরদখল ভূমি বিরোধের কারনে শাল বনের অস্তিত্ব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাদ্যচক্র জীববৈচিত্র্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মানুষের অস্তিত্বের জন্য বন্যপ্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকোট্যুরিজমের উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, গবেষণা চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ভাওয়ালগড় এলাকায় ‘‘সাফারী পার্ক’’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করা হয়

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন মাওনা ইউনিয়নের বড় রাথুরা মৌজা সদর উপজেলার পীরুজালী ইউনিয়নের পীরুজালী মৌজার খন্ড খন্ড শাল বনের ৪৯০৯. একর বন ভূমি ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত এর মধ্যে ৩৮১০. একর এলাকাকে সাফারী পার্কের মাস্টার প্ল্যানের আওতাভূক্ত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১০ সালে ৬৩.৯৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং পার্ক প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০১১ সালের ফেব্রয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর এর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয় প্রকল্পের শুরুতে কোন মাষ্টার প্লান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি পরবর্তীতে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানের সাফারী পার্কে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি মাষ্টার প্লান তৈরী করা হয় মাষ্টার প্লানে বর্ণিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন ভূমি অধিগ্রহনের জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে অক্টোবর ২০১১ তারিখে ’’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, গাজীপুর (১ম সংশোধিত) প্রকল্পটি একনেক কর্তৃক বর্ধিত আকারে ২১৯.৮৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত হয় পরবর্তীতে অক্টোবর / ২০১৩ মাসে একনেক কর্তৃক ২৬৩.০০ কোটি টাকা ব্যয়েবঙ্গবন্ধু শেখমুজিব সরকারী পার্ক , গাজীপূর (২য় সংশোধন) প্রকল্প পাশ হয়

সাফারী পার্কটি দক্ষিণ এশীয় মডেল বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সাফারী ওয়ার্ল্ড এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপন করা হয়েছে এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বালি সাফারী পার্কের কতিপয় ধারনা সন্নিবেশিত করা হয়েছে সাফারী পার্কের চারদিকে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী ঘেরাা এবং উহার মধ্যে দেশী/বিদেশী বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে পর্যটকগণ চলমান যানবাহনে অথবা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করে শিক্ষা, গবেষণা চিত্তবিনোদনের সুযোগ লাভ করবেন সাফারী পার্কের ধারনা চিড়িয়াখানা হতে ভিন্নতর চিড়িয়াখানায় জীবজন্তুসমূহ আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং দর্শনার্থীগণ মুক্ত অবস্থায় থেকে জীবজন্তু পরিদর্শন করেন কিন্তু সাফারী পার্কে বন্যপ্রাণীসমূহ উন্মুক্ত অবস্থায় বনজঙ্গলে বিচরণ করবে এবং মানুষ সতর্কতার সহিত চলমান যানবাহনে আবদ্ধ অবস্থায় জীবজন্তুসমূহ পরিদর্শন করবেন

অবস্থান আয়তন
ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার থেকে কিলোমিটার পশ্চিমে সাফারী পার্কটির অবস্থান সাফারী পার্কের আয়তন ৩৮১০. একর এর মধ্যে ৫৫০ একর ব্যক্তি মালিকানাধী ভুমি রয়েছে যা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে বর্তমানে ৩৪০০. একর এলাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে অবশিষ্ট এলাকা পর্যায় ক্রমিকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে

ঐতিহাসিক পটভূমি
গাজীপুরের শাল বন ঐতিহাসিকভাবে ভাওয়াল রাজার জমিদারী অংশ হিসেবে খ্যাত ছিল ১৯৫০ সলের জমিদারী উচ্ছেদ প্রজসত্ব আইন জারীর পর শালবনের ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর করা হয় তবে অধিকাংশ চালা জমির শালবন সমৃদ্ধ বনভূমি বিধায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাইদ জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন শালবন ঢাকার অতি নিকটে হওয়ায় দ্রুত শিল্পায়ন, জবর দখল, গো-চারণ ভূমিদস্যুতার কারণে শালবনের জীববৈচিত্র্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পকারখানা হতে নিঃসরিত বর্জের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে

সাফারী পার্কের মূল উদ্দেশ্য
() শাল বনের বন্যপ্রাণী উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ
() বাংলাদেশের বিরল বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণীকে নিজ আবাসস্থলে (in-situ) এবং আবাসস্থলে বাহিরে (ex-situ) অবস্থায় সংরক্ষণ উন্নয়ন সাধন
() ঢাকা মহানগরীর অতি নিকটে ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা
() চিত্তবিনোদন, শিক্ষা বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা
() বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ফলজ, ফডার, মিশ্র প্রজাতির বাগান সৃজন
() শালবনের বন্যপ্রাণী যেমন বানর, মায়া হরিণ, বেজী, বনরুই, বাঘদাস, বন বিড়াল, খড়গোশ, শিয়াল, খেকশিয়াল অজগরসহ বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সৃষ্টি সংরক্ষণ করা
() বিরল বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন বাঘ, চিতাবাঘ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণ এবং অন্যান্য তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বংশবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা
() গণ্ডার, এশীয় হাতী, পরিযায়ী পাখী, জলজ পাখী, বনছাগল, সিংহ, শ্লথ বীয়ার, কালো ভাল্লুক, মিঠা পানির কুমির, লোনা পানির কুমির, নীল গাই, জলহস্তী ইত্যাদি বিপন্ন বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণকরন
() আহত উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার নিমিত্তে বন্যপ্রাণীর সেবাশ্রম হাসপাতাল স্থাপন
(১০) সারাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি

পর্যকটগণ যা উপভোগ করবেন
.   তথ্য শিক্ষা কেন্দ্রে ভিডিও ব্রিফিং/প্রামাণ্য চিত্রের মাধ্যমে সাফারী পার্ক সম্পর্কে সাম্যক ধারণা নিতে পারেন
.   ন্যাচারেল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বন্যপ্রাণী উদ্ভিদ প্রজাতি বৈচিত্র্য সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রী গবেষকগণ পরিচিতি লাভ      করতে পারেন
.   প্রটেকটেট মিনিবাসে চড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচারণরত বাঘ, সিংহ, হাতী, সাম্বার, মায়া হরিণ,চিত্রা হরিণ, বানর, হনুমান, ভল্লুক, গয়াল, কুমির বিচিত্র পাখী দেখাতে পাবেন
.   লেকের ধারে দেখতে পাবেন অসংখ্য অতিথি জলজ পাখী
.   পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে বনাঞ্চলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য বন্যপ্রাণী অবলোকন করতে পারবেন
.   পাখীশালায় দেখতে পাবেন দেশী-বিদেশী অসংখ্য পাখী
.   বেস্টনীতে বিরল প্রজাতির প্যারা হরিণ
.   রাত্রি যাপনের জন্য রাখছে বিশ্রামাগার

পর্যটকদের জন্য অনুসরণীয়
.   পলিথিন অপচনশীল পদার্থ যত্র-তত্র না ফেলে ডাস্টবীনে রাখুন
.   সিগারেটের প্যাকেট, পরিত্যক্ত কাগজ, নষ্ট ব্যাটারী, লাইটার বিস্কুট, চানাচুর প্রভৃতির প্লাস্টিকের মোড়ক যেখানে সেখানে না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা
.   বাঘ সিংহের বেস্টনীতে চলন্ত গাড়ী হতে না নামা
.   কোমল বিশুদ্ধ পানীয় বোতল জঙ্গলে না ফেলা
.   মাইক বাজানো, বাজি বা পটকা ফোটানো, গান-বাজনা দলবদ্ধভাবে হৈ-চৈ না করা
.   বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে হলে আপনাকে পূর্ব থেকে বুকিং নিতে হবে
.   পূর্বেই টিকেট কাউন্টার হতে টিকেট ক্রয় বাঞ্চনীয়
.   বন্যপ্রাণীকে যেকোন ধরণের খাবার প্রদান থেকে বিরত থাকবেন
.   বাইরের কোন খাবার পার্কের ভিতরে না নেওয়া

Bangabandhu Sheikh Mujib Safari Park, Gazipur

The largest Safari Park in Asia ‘Bangabandhu Sheikh Mujib Safari Park’ Bangladesh. The Park is in Gazipur district which is just near to Dhaka city.
From Dhaka to park distance nearby 40KM (Kilometres) in Bagher Bazar, The Bagher Bazaar is Dhaka Mymensingh highway after pass Joydobpur (Gazipur) Chowrasta, then go forward along the Mymensingh road and come to Bagher Bazaar then you have to choose the path (road) of west side. You have to use auto Rickshaw or CNG as transports to reach at the park. Bangabandhu Safari Park is three kilometres away from Bagher Bazaar. After getting inside the park, you will see
Tiger,
Lion,
Kangaroo even Dinosaur also(but these are not alive).

All of these animals are statue indeed for welcoming the visitors. The whole park is consists of about 4000 acres of land. Recently  Dof (Department of  Forest) released Tiger, Lion, White Lion, Bear, Maya Deer, Sambar Deer, Zebra, Giraffe, Wild Coast, Camel, Emu etc to attract local and International visitors. In the park, they have set up a lot of things like
Information And Education Centre,
Nature History Museum,
Park Office,
Rest Room, Dormitory,
Wild Life Hospital,
Crocodile Park,
Lizard Park,
Fancy Duck Garden,
Crown Figent Aviary,
Parrot Aviary,
Dhonesh Aviary,
Macaws Land,
Marine Aquarium,
Orchid House,
Butterfly Garden,
Climate House,
Vulture Corner,
Pending Bridge,
Monitoring Tower,
Fountain,
Tiger Observation Restaurant,
Tortoise Breeding Centre,
Eco-Resort,
Food Court,
Elephant Show Gallery,
Bird Show Gallery And
Child Park.

Here is arrangement of bus and zip service for visitors (local & international)
Entrance Time: 9AM to 5PM everyday. Weekend: Tuesday.
Entry Fees: Adult BDT -50.00, Kids BDT-20.00, Foreigner BDT-400.00
Foods: Inside the parks have food arrangement with good restaurant, you can take your food from here (it’s little expensive).
Outside food is not allowed inside the park.
More Info:
* Safari by AC Bus: 100 Tk (The bus will take you into the Lion and Tigers area).
* Living with Bird: 10 Tk
* Living in the Jungle: 10 TK
* Paddle Boat riding: 50 TK
* CNG and Auto available there. You can go there by Taxi or private car also.
* Auto: Fare Tk. 20-30 per person (From Bager bazaar to Park area).
* Private Car parking : Tk 100.00 per car.



Information from- Bangabandhu Sheikh Mujib Safari Park, Gazipur

Friday, May 13, 2016

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বজ্রপাতে নিহত ২

কাপাসিয়ায় পৃথক বজ্রপাতে এক ক্ষেতমজুর ও গৃহবধূ নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো- কুড়িগ্রাম জেলার কচাকাটা থানার সাতআনা গ্রামের সানাউল্লাহ বেপারীর ছেলে আব্দুস সাত্তার আলী (২৬) এবং কাপাসিয়া উপজেলার সিঙ্গুয়া পশ্চিম পাড়া গ্রামের কাজল মিয়ার স্ত্রী রুবি (৪০)।
কাপাসিয়া থানার এস আই মোঃ শাহজাহান মিয়া জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে তরগাঁওয়ের উত্তর খামের গ্রামের আব্দুর রশীদের জমির ধান কেটে বাড়ি ফিরছিল শ্রমিক সাত্তার। এসময় বিকট শব্দে হঠাৎ বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই সাত্তার মারা যায়।

অপরদিকে, প্রায় একই সময় একই উপজেলার সিঙ্গুয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার গৃহবধু রুবি মাঠ থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। এসময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই রুবি মারা যায়। বজ্রপাতের কারনে উভয়ের বুক ঝলসে গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করে।

খবর - গাজীপুর কণ্ঠ

Wednesday, May 11, 2016

কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যার একসময়ের ভরসা সেই ফেরি

যখন কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ফকির মজনু শাহ সেতু নির্মান হয়নি এই ফেরি দিয়েই গাড়ী, ট্রাক সহ সকল ভারী যানবাহন পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ছিল। ব্রীজ নির্মান হওয়ার পর তা আর চোখে পড়ে না।তা এখন স্মৃতির পাতায় দেখা যায় বার বার।
আরেকটি ফেরি রয়েছিল এখনো আছে কিনা সঠিক জানা নাই তা হল আমাদের টোকের ফেরিঘাট।

ছবি সংগ্রহঃ MD Hosson

Saturday, May 7, 2016

ভাওয়াল বীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার এর জীবনী

ভাওয়াল্ বীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার একজন প্রকৃত  দেশপ্রেমিক, রাজনীতিবিদ,  
শ্রমিক নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে তিনি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জুন, ১৯৯৬ এবং আক্টোবর ১, ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অস্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ গাজীপুর-২ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী শ্রমিকলীগের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন।

জন্ম ও পরিবারঃ ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর, তৎকালীন গাজীপুর জেলার পুবাইল ইউনিয়নের হায়দরাবাদ গ্রামে সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন আহসানউল্লাহ।মাতা বেগম রোসমেতুন্নেসা ও বাবা পীর সাহেব শাহ সূফি আবদুল কাদের পাঠান। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের বড় ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল এমপি ও ছোট ছেলে  জাবিদ আহসান সোহেল (১২ই জুলাই ২০১৩ ইং  সনে ৩৩ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন )।


শিক্ষা ও কর্মজীবনঃআহসান উল্লাহ মাষ্টার এর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। আহসানউল্লাহ ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর আহসানউল্লাহ টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি ওই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) ও প্রধান শিক্ষকের (১৯৮৪-২০০৪) দায়িত্ব আমৃত্যু যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেন। আহসানউল্লাহ মাস্টার টঙ্গী শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।রাজনৈতিক জীবনঃ১৯৬২ এ হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন এর বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৬৮ সালে তথাকথিত আগরতলা মামলায় বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ‘মুজিব তহবিল’-এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রয় করেন। ১৯৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ এর এগার দফার আন্দোলনে সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি । ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের ক্যান্টনমেন্টের বাঙালী সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে আসা পাকিস্তানী বাহিনীকে ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেয়ার জন্য জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ডাক দেন বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আটক হন এবং নির্যাতিত হন। আহত অবস্থায় আহসান উল্লাহ মাস্টার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক ও নির্যাতিত হয়েছিলেন। ভারতের দেরাদুনের তান্দুয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে পুবাইল, টঙ্গী,  ছয়দানাসহ বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ – করেছিলেন।১৯৮৩ এবং ১৯৮৮ সালে তিনি পূবাইল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জাতীয় শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ,সাধারণ সম্পাদক ও কার্যকরি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) চেয়ারম্যান ছিলেন।ছিলেন।শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালে শ্রমিকদের জন্য ৯টি বস্ত্রকল নামমাত্র মূল্যে সমবায় সমিতির মাধ্যমে পরিচালনা করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি ১৯৮৩ সাল, ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৭ সাল, ১৯৮৮ সাল ও ১৯৯০ সাল, ১৯৯৫ সাল, ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী নেতা হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা গর্ব করার মতো। তিনি শিক্ষকদের নেতা ছিলেন। টঙ্গীর শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে সবার প্রিয়ভাজন হয়েছেন। কিন্তু আমাদের ট্র্যাজেডি হচ্ছে যে স্কুলে তিনি প্রধান শিক্ষক, সেই স্কুলের বিজ্ঞান ভবনের সামনে ২০০৪ সালের ৭ মে কুচক্রীমহল গুলি করে হত্যা করে তাঁকে। ঐ প্রিয় শিক্ষকের গড়া স্কুল রক্তাক্ত হলো তাঁর নিজের রক্ত দিয়ে।হে মহান নেতা, তোমায় শ্রদ্ধা জানাই ।মহান রাব্বুল আলামিন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুক সেই প্রার্থনা আমাদের সকলের ।  

 

সংগ্রহকৃত কিছু ছবি
 



 

আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে আহসান উল্লাহ মাষ্টার
জেনেভা-শহরে-আইএলও-ILO-কনফারেন্সে-আহসান-উল্লাহ-মাস্টার





একটি ভিডিও লিঙ্ক নিচে দেখতে ক্লিক করুন
শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার
http://www.frequency.com/video/x/165270932

Monday, May 2, 2016

গাজীপুরের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব স্বভাব কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

গোবিন্দচন্দ্র দাস(১৮৫৫-১৯১৮) – 
তাঁর জন্ম, জয়দেবপুর, ভাওয়াল-গাজীপুর,৪ মাঘ ১২৬১ (জানুয়ারি ১৮৫৫)এক দরিদ্র কায়স্থ পরিবারে জন্ম । পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতা রামনাথ দাসের পরলোক গমন করেন ।
ভাওয়াল–রাজ কালীনারায়ণ রায়ের অন্নে ও অনুগ্রহে লালিত-পালিত ও শিক্ষা প্রাপ্ত হন তিনি । জয়দেবপুর মাইনর স্কুল থকে ছাত্রবৃত্তি পাস করে ঢাকা মেডিকেল স্কুলে ভর্তি । শব ব্যবচ্ছেদের  ভয়ে চিকিৎসাবিদ্যালয় পরিত্যাগ করেন । ভাওয়ালের কুমার রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের প্রাইভেট সেক্রেটারি নিযুক্ত । জনৈক প্রজাপীড়ক কর্মচারীকে ভাওয়াল-রাজ কর্তৃক কঠোর দন্ড প্রদান না করার প্রতিবাদে চাকরি ত্যাগ(১৮৭৭) করেন । কাজের সন্ধানে ময়মনসিংহ আগমন করেন। সুসঙ্গ -দুর্গাপুরের জমিদার মহারাজ কমলকৃষ্ণ সিংহের খাজাঞ্চি পদে নিযুক্ত লাভ(১৮৭৯) করেন । পরের বছর মুক্তগাছার জমিদার মহারাজ কেশবচন্দ্র আচার্য চৌধুরীর কার্যকারক নিযুক্ত(১৮৮০)  হন । ১৮৮২ সালে ময়মনসিংহ প্রবেশিকা বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় পণ্ডিতের পদে যোগদান । স্কুলটি উঠে গেলে ময়মনসিংহ সাহিত্য সমিতির ধ্যক্ষ নিযুক্ত হন । ১৮৮৪-তে শেরপুরে ‘চারুবার্তা’  পত্রিকার কার্যাধ্যক্ষের পদ গ্রহন করেন । ১৮৮৬-তে শেরপুরের জমিদার হরচন্দ্র রায়চৌধুরী কর্তৃক তাঁর জমিদারির কৃষি  বিভাগের ইন্সপেক্টর নিযুক্ত হন । ১৮৮৮-তে হরচন্দ্রের প্রাইভেট সেক্রেটারি  পদে যোগদান ।কলকাতার সাপ্তাহিক ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্রনারায়াণ রায় (কালীনারায়ণ রায়ের  মৃত্যুর পর উনি ই রাজা হন) ও রাজমন্ত্রী সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষের অনেক অপ্রীতিকর প্রসঙ্গের অবতারণা করে এক প্রবন্ধ গোবিন্দচন্দ্রের রচিত বলে কালীপ্রসন্ন ঘোষ রাজার কর্ণগোচর করেন । গোবিন্দচন্দ্রের বক্তব্য অনুসারে কথিত প্রবন্ধটির লেখক  তিনি নন,অন্য কেউ । কালীপ্রসন্ন ঘোষের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে রাজা তাঁকে জয়দেবপুর থেকে নির্বাসন দেন (ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৮৯২) গোবিন্দচন্দ্র জয়দেবপুর ত্যাগ করে কর্মস্থল শেরপুর চলে যান । তিনি ‘মগের মুল্লুক’ (১৮৯২) নামে একখানি বঙ্গকাব্য রচনা করে তাঁকে তাঁর জন্মভুমি জয়দেবপুর থেকে অন্যায়ভাবে বিতাড়িত করার প্রতিশোধ নেন । ভাওয়াল রাজ্যের প্রজামণ্ডলীর উপর রাজার অমানুষিক পৈশাচিক কাহিনী এতে অগ্নিময়ী ভাষায় উপস্থাপিত । প্রথমা পত্নী সারদাসুন্দুরীর মৃত্যুর প্রায় সাত বছর পর বিক্রমপুরের ব্রাহ্মণগ্রামে শ্বশুরালয়ে গৃহ নির্মাণ করে তথায় বাস । ১৮৯৫-এ কলকাতায় নব্য ভারত প্রেসের কার্যাধ্যক্ষের পদ অংকৃত । ১৮৯৬-এ মুক্তগাছার জমিদার মহারাজ সুর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী কাশহাটি কাছারীর নায়েব নিযুক্ত । ১৮৯৮-এ বেগুনবাড়িকাছারীতে বদলি । ১৯০২-এ কর্মত্যাগ । আজীবন দরিদ্রাবস্থায় দিন যাপন । জীবনে ১০/১২ টি চাকরীতে নিয়োজিত ছিলেন । অব্যবস্থিত চিত্ততার জন্য কোন চাকরিই দীর্ঘকাল করতে পারেননি । স্বীয় ত্রুটির জন্য অনেকবার কর্মচ্যুত হয়েছেন । স্বভাব কবি হিসেবে খ্যাত । নারীভক্তি, পতি-পত্নীর প্রেম, ভ্রাতৃস্নেহ, সন্তানবাৎসল্য, বন্ধুপ্রীতি, গার্হস্থ্য জীবনের সুখ-দুখের কাহিনী, পল্লীজিবনের আলেখ্য, জাতীয় উদ্দিপনা ও স্বদেশপ্রেম তাঁর কবিতায় নিরাভরণ ভাষায় চিত্রিত । কবিতাগ্রন্থঃ প্রেম ও ফুল(১৮৮৭), কুস্কুম(১৮৯১), মগের মুল্লুক(১৮৯২), কস্তরী(১৮৯৫), চন্দন(১৮৯৬), ফুলরেণু(১৮৯৬), বৈজয়ন্তী(১৯০৫), শোক ও সান্ত্বনা(১৯০৯)
১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় মিটফোর্ট হাসপাতালে বিনা চিকিতসায় নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । 



তথ্যসূত্রঃ বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা -গাজীপুর 
পূর্ববর্তী পোষ্টঃ 

গাজীপুরের বনভূমি ও গাছপালা || বাংলাদেশ





Saturday, April 30, 2016

গাজীপুরের বনভূমি ও গাছপালা || বাংলাদেশ

জেলা পরিচিতি গাজীপুর


পর্ব নং ০৩ - গাজীপুরের বনভূমি ও গাছপালা
গাজীপুরের প্রধান ফসল ধান, পাট ও শাকসবজি প্রভৃতি ব্যতীত গাজীপুরের টিলার উপরিভাগের প্রাকৃতিক বনে গজারী, বহেড়া, আমলকি, জলপাই, কড়াই, সোনালু, দাতাই, তিতিজাম, আন্নাই, চাল্লাগুটি, কারজলি, কোলকাটা, মোনকাটা, হাতিশুঁড়, দ-কলস প্রভৃতি বৃক্ষ জন্মে
অপেক্ষাকৃত নিচু টিলা টেক নামে অভিহিত । আবার কিছু কিছু ঢিবিও রয়েছে । এসব জায়গায় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষ জন্মে এবং চাষও করা হয় ।গাজীপুরের টেকে ভাওয়ালের উৎকৃষ্ট আনারস জন্মে ।এছাড়া এসব টেকে আম, কাঁঠাল, জাম, তেঁতুল, বরই ইত্যাদির বাগান করা হয় । টিলা টেকের নিম্নাংশের  জলাভুমিতে ছনকাশদুর্বাহোগলা প্রভৃতি স্বাভাবিকভাবে জন্মে । বর্ষায় এসব এলাকা প্লাবিত হয় বলে  এখানে শাকসবজির চাষ এবং ধানের চারা লাগানো হয়।
ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্ক

গাজীপুর জেলার বিস্তীর্ণ সমভুমিকে বলা হয় ‘চক’ । চকে সাধারণত পানি উঠেনা । চক হল তিন ফসলী  জমি । শ্রীপুরে চককে বলা হয় পাথার ।

গাজীপুর শালবনের জন্য বিখ্যাত । বাংলাদেশের বৃহত্তম এই শালবন বর্তমানে ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্ক বা ভাওয়াল  জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত । এখানে সর্বাধিক শাল বা গজারী বৃক্ষ থাকায় এর  স্থানীয় নাম ‘গজারী বন’ । এছাড়া এখানে কড়ইকুম্ভীমশিরিষবহেড়া ও অন্যান্য বৃক্ষ রয়েছে ।


যারা ১ ও ২নং পোষ্টটি দেখতে মিস করেছেন
তাদের জন্য নিচে লিংক দেয়া হল

Thursday, April 28, 2016

বঙ্গতাজ কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস | কাপাসিয়া

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ  - কিউএমকাদের

১৯৭২ সনের জানুয়ারি মাস থেকে আমাকে এবং আমার কলেজের সেক্রেটারিস্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম শামসুদ্দিন সাহেবকে কলেজের বাউন্ডারির মাঝে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না । কারণ আমরা নাকি মুসলিম লীগের লোক । অর্থাৎ আওয়ামীলীগ করছিলাম না । এক এক করে ৬ মাস – জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন – পর্যন্ত বেতন দিয়ে যাচ্ছে কলেজের স্থানীয় কমিটি।

অথচ-  আমাদের কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান জনাব মরহুম গাজী মইজুদ্দিন সাহেব এসব বিষয়ে অবগত ছিলেন না। ইতিমধ্যে আমি চেয়ারম্যান সাহেবের ঢাকা, সিদ্ধেশরীর বাসায় কলেজের একটা জরুরী মিটিং এ ছিলাম । ওখানে সব ঘটনা খুলে বলে আমি কলেজে আর থাকব না,  বলতে উনি খুব মনঃক্ষুণ্ণ হলেন এবং বলেন – “ আমি আসছি কোন চিন্তা কবেন না” । আমি যদি কোন কারণে রেগে যেতাম তাহলে কিছুতেই থামাতে পারতাম না । আমি একখানা পদত্যাগ পত্র উনার কাছে জমা দিলাম ।
     
এদিকে জামালপুর  কলেজের গণ্ডগোলের কথা ওপাড়ে পলাশের লোকেরা সবাই জেনে গেছে । আমাকে ওরা বলেছে, প্রিন্সিপাল সাহেবে শুধু নদীটা পার হোন ।যা করার আমরাই করব । আপনাদের কী কী দরকার সবই পাবেন – ইত্যাদি । পলাশের ২/৩ জন স্থানীয় অধ্যাপকও জামালপুর কলেজে ছিল । তারা স্থানীয় চেয়ারম্যান মরহুম নুরুল ইসলাম  সাহেবসহ সবাই এবং অর্ধেকের বেশি ছাত্র ছাত্রীও ছিল পলাশের । সকলেই আমাকে নেয়ার জন্য এক পায়ে দাঁড়ালো । সভাপতি সাহেবের কাছে আমি চাকুরীর অব্যাহতি পত্র জমা দিয়ে জামালপুর এসে সেক্রেটারী সাহেবকে বললাম “ভাই সাহেব, আজ জামালপুরের ১২/১৩ বছরের মায়া কেটে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পারে চললাম । আমি যদি ১ মাসের মধ্যে জামালপুর কলেজের ইট, কাঠ সহ এবং ছাত্র –শিক্ষক ওপারে নিতে না পারি, তবে আমার নাম কাদের না ।আমার কথা শুনে মরহুম শামসুদ্দীন সাহেব চিৎকার দিয়ে উঠে আমাকে ঝাপতে ধরে বলে উঠলেন, “ভাই –তুমি তোমার গ্রামে গিয়ে একটি কলেজ কর । পলাশ কর না ।তাহলে জামালপুর কলেজটা থাকবে না ।তাই তুমি পারবে আল্লাহ্‌ তোমাকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে ।জামালপুর কলেজটা আমার বুকের উপরে থাক – আমি এই ভিক্ষাটা চাই  ।”   
     আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম এবং বলে উঠলাম এই জামালপুর হাইস্কুল, কলেজ এই এতসব কিছু আপনার –আর কিছু ছেলে- পুলে আপনাকে –আমাকে স্কুলে, কলেজে আসতে দিচ্ছে না – তাহলে এত দরদ কিসের । তিনি বলে উঠলেন, “তবুও কলেজটা আমার বুকের উপরে থাক ।” আমি স্থির করে রেখেছিলাম পলাশেই চলে যাব এবং জামালপুরবাসীকে দেখাব কলেজ কিভাবে করতে হয় । কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেবের কথাশুনে আমার মনে পড়ল খিরাটিতে কিছু লোকও তো আমাকে অপমান করেছিল এবং আমি চলে এসেছি । পৃথিবীতে কিছু লোক থাকে যারা মানুষকে অপমান করে, সম্মান করতে জানে না । কিন্তু আল্লাহ্‌ যাকে চান সম্মানিত করেন, মানুষ তার কোন ক্ষতি করতে পারে না । সব অপমান ভুলে আবার চিন্তা করতে লাগলাম নিজের গ্রাম খিরাটিতে কিভাবে কলেজ করা যায় । সে ভাবনা থেকে পলাশ না গিয়ে খিরাটিতে চলে গেলাম ।তখন না পারলেও পরবর্তীতে ১৮/১৫ বৎসর পরে পলাশ কলেজটি আমিই প্রতিষ্ঠিত করেছি ।
     
এর মাঝে একদিন ডাঃ ছানাউল্লাহ মামা বলেছিলেন, এ সময় এম. পি. মন্ত্রী – মিনিস্টার ছাড়া কলেজ করা সম্ভব নয় । এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে –ছাত্রদেরকে নিয়ে এম. পি, মন্ত্রীদের অনুমতি নেয়া প্রয়োজন মনে করি ।তাই ছাত্রদের নিয়ে ঢাকা যাওয়া ।
     
১৯৭২ ইং সনের জুন মাসের কথা । আমি তখন ঘোড়াশাল জামালপুর কলেজের অধ্যক্ষ । তখনকার অর্থমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন সাহেবকে আমরা জামালপুর কলেজের সংবর্ধনা দিয়েছিলাম ।তাঁকে উপাধি দিয়েছিলাম “বঙ্গতাজ” বলে ।সে কথাটাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল ।
     
যাক সে কথা । খিরাটি গিয়ে স্কুলের ছেলেদের নিয়ে ঢাকায় রওনা হলাম । উদ্দেশ্য জনাব মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে দেখা করে খিরাটিতে একটা কলেজ করার অনুমতি নেওয়া ।এর আগে আমাদের এলাকার কৃতি ব্যক্তি বাংলাদেশের প্রথম এটর্নী জেনারেল মরহুম ফকির শাহাবউদ্দিন আহমদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রয়োজন মনে করি ।
     
ঢাকায় আসার পথে আড়াল বাজার হতে জনাব মরহুম সাদির মোক্তার সাহেবের লঞ্চে ঘোড়াশাল পৌছি ।ঘোড়াশাল ষ্টেশনে ছেলেদের হোটেল থেকে সিংগারা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় ।হোটেলের মালিক জনাব মরহুম কালা মিয়া ছাত্রদের খাওয়ান ।তারপর ট্রেনে উঠার পালা । ষ্টেশন মাস্টার আমার পরিচিত ।তিনি ব্যবস্থা করলেন, লোকাল ট্রেনটি পরে আসবে –তখন যেন ছেলেদের নিয়ে ট্রেনে চড়ি ।কিন্তু মেইল ট্রেনটি ষ্টেশন দাঁড়ানোর সাথে সাথে ছাত্ররা হুড়মুড় করে গাড়ীতে উঠে গেল – কে শুনে কার কথা । তখন গাড়ীর গার্ড সাহেব জানতে চাইলেন ছাত্রদের টিকেট হয়েছে কিনা ।আমি বললাম না । তখন গার্ড সাহেব বললেন তাহলে – আপনাদের তেজগাঁও ষ্টেশনে নামতে হবে । আমি বললাম যে আমরা তেজগাঁও ষ্টেশনেই নামব । এতে গার্ড সাহেব আশ্বস্ত হলেন ।
তেজগাঁও নেমেই আমরা সবাই পায়ে হেঁটে ধানমণ্ডির শাহাবুদ্দীন সাহেবের বাসার দিকে রওনা দেই ।ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে উনার ধানমণ্ডির বাসায় হাজির হই । আমাদের দেখে শাহাবুদ্দীন  সাহেব খুব নাখোশ হলেন ।খিরাটিতে কলেজ করার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক  মন্তব্য করে অতিদ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে তিনি নিজস্ব কাজে চলে যান ।তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই মন্ত্রী পাড়ায় অর্থমন্ত্রী মরহুম জনাব তাজউদ্দিন সাহেবের বাসায় ১২৫ জন ছাত্র নিয়ে রাত ১২ টার দিকে হাজির হই ।ছাত্রদের মধ্যে মনে পড়ে চান মিঞা, আঃ আউয়াল,নুরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর – বিন-হামিদ ।ছেলেদের মধ্যে মাতাব, মতি মিঞা, মনি, ফজলু  – আরও অনেকে সবার নাম তো এখন এর মনে নেই ।মরহুম তাজউদ্দিন সাহেব আমাদেরকে খুব আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করলেন এবং আমাদের কথা শুনলেন ।শুনে বললেন, “মনোহরদী কলেজটি তোমার কলেজটিকে খেয়ে ফেলবে ।” অর্থাৎ করতে দিবে না তিনি ভেবেছিলেন ।
     
কিন্তু পিড়াপিড়ি করতে তিনি বললেন, “কলেজ করতে পারলে কর – ভাল ।” আমি ঘোড়াশাল ষ্টেশনে বসে ৫ পয়সা দামের এক তা’ কাগজ কিনে একটা দরখাস্ত লিখে রেখেছিলাম । সেটা জনাব মন্ত্রী সাহেবের সামনে ধরে বলেছিলাম – “আপনি একটা কিছু লিখে দিন ।” মরহুম মন্ত্রী সাহেব কাগজের এক কোনায় লিখলেন – “খিরাটিতে কলেজ করার ব্যাপারে আমি সকলের সাথে একমত ।সাধ্যমত সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ।” এই লিখে নিচে সই দিলেন – তাজ আহমেদ ।তখন উপস্থিত যুবকরা আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং তাজউদ্দিন সাহেবের নামে স্লোগান দিতে থাকে ।রাত তখন প্রায় ২ টা আমি সবাইকে বলি বাবারা তোমরা থাম ; এখন অনেক রাত । সেই দরখাস্ত তো মন্ত্রীর দস্তখতসহ আবেদন পত্রটি কোথায় হারিয়ে গেছে মনে নেই । এত রাতে ছেলেদের নিয়ে কমলাপুর ষ্টেশনে পৌছাই ।    
সেই রাত দুপুরে জনাব তাজউদ্দিন সাহেবের বাসা হতে কমলাপুর রেল ষ্টেশনের উদ্দেশে রওনা হলাম ।মন্ত্রী মহাদয় একখানা নাইট পাশে ছিলেন যাতে রাস্তায় কোন অসুবিধা না হয় । মিন্টু রোডের মন্ত্রীর বাড়ী হতে রাত ২ টায় হেঁটে এসে ষ্টেশনে পৌছলাম । এত রাতে কোন হোটেলেই কোন খাবার নেই ।আর এত গুলি ছেলের খাবার কেইবা প্রস্তুত করে রাখে । ৪/৫ টা হোটেল থেকে কিছু ভাত ডাল যোগাড় করে ওদেরকে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো ।সেই গতকাল সকালে বাড়ী থেকে ছেলেরা খেয়ে এসেছিল, আর এখনও পর্যন্ত কোন ভাত তাদের পেটে পরেনি । সত্যিই অনেক কষ্ট আমার গ্রামের ছেলেরা এই কলেজের জন্য  মাথা পেতে নিয়েছিল । কিছু খাওয়ার পর ষ্টেশনে  এখানে সেখানে ছেলেরা বসে রইলআর আমি একখানা খবরের কাগজ পেতে মেঝেরে শুয়ে পড়লাম ।ভোর পাঁচ (৫) টায় লোকাল ট্রেন । সব ছেলেদের টিকেট করতে হয়েছিল কি না মনে নেই তবে সকলেই ট্রেনে উঠে পড়ল ।যথা সময়ে ট্রেন ছাড়ল ।ওদেরকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আমি ষ্টেশনেই রইলাম ।ফজরের নামাজ পড়ে আমি ডাঃ ছানাউল্লাহ সাহেবের বাসায় পৌছালাম । ডাঃ ছানাউল্লাহ সাহেবকে গতকালের সব ঘটনা খুলে বললাম । তাঁকে বললাম কলেজের জন্য একটা হ্যান্ডবিল ছাপাতে বললেন ।
     
ছাপালাম হ্যান্ডবিল । কলেজের কাজ শুরু করেছিলাম । ১ দিন পর খিরাটি গেলাম ।খিরাটিতে কলেজের জন্য মিটিং দিলাম ।লোকজন এলো কিন্তু হাতে গোনা কয়জন ।আর আমরা ছাত্ররা সব ।প্রথম মিটিং এর সভাপতি হতে সহজে কেউ রাজী হলেন না । চর দুলর্ভখাল ডাঃ মরহুম আঃ আউয়াল সাহেবকে দিয়ে সভাপতির কাজ চালিয়ে দিলাম । গ্রামের লোকেরা মনে মনে হাসে- আবার মরুব্বী শ্রেণীর সবাই বলে – এ কাদিরের পাগলামী ।”
     
যেই যা বলুক, কলেজ শুরু করেছি অতএব এ কাজ শেষ করতেই হবে ।আল্লাহ তায়ালার অসীম রহমত এই ছিল যে খিরাটি হাইস্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে একজন প্রধান শিক্ষক জনাব এ. হাসেম – বাংলায় এম. এ । ২ জন সহকারী শিক্ষক জনাব গোলাম রব্বানী ইসলামের ইতিহাস – এম . এ । বাবু নারায়ন চন্দ্র ছিলেন কমার্সের ব্যবস্থাপনায় এম কম । এর আমি একজন । ঐ মোট ৪ জন অধ্যাপক কাজ শুরু করে দিলাম । ঘর দরজা নেই । হাই স্কুলের সামনে কাঁঠাল গাছের নিচে স্কুল থেকে বেঞ্চ টুল বের করে কলেজের ক্লাস শুরু হলো । কলেজের সেশন –  ১৯৭২ -৭৩ ইং সনে প্রথম শুরু । ছাত্র –ছাত্রী ভর্তি শুরু হলো । মানুষের হাতে পায়ে ধরে ছাত্র/ছাত্রী ভিক্ষা আরম্ভ হলো ।এর মধ্যে জনাব তাজউদ্দিন সাহেবের কাছে যেয়ে বললাম ছাত্র –ছাত্রী ভর্তি শুরু করে দিয়েছি । তিনি বললেন, “কলেজের ঘর দরজা, জায়গা জমি সব কিছু না হলে তো সরকারী স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না ।এ সব ঠিক করে পরে আস ।” ছাত্র/ছাত্রী ভর্তির পাশাপাশি শুরু হলো ঘর, টুল, বেঞ্চ, জায়গা-জমির ব্যবস্থা করন ।আমার মরহুম পিতা কাজী মোঃ আঃ বাছির ও মরহুম চাচা মোশাররফ হোসেন সাহেবকে ধরলাম তাদের জমির একটু (কলেজের মাঠে অবস্থিত ছিল) দেওয়ার জন্য । তারা কলেজের নামে লিখে দিলেন । আমার খরিদ করা ২ বিঘা জমি কলেজের নামে লিখে দিয়েছিলাম । যা এখন এর নেই । নদীতে ভেঙ্গে নিঃশেষ হয়ে গেছে ।আমার ছোট ভাই কাজী আঃ বাকীর শ্বশুর মরহুম জনাব আহাম্মদ আলী সাহেবের একখণ্ড জমি কলেজের মাঠে ছিল । ওর কাছ থেকেও হাতে পায়ে ধরে জমিটুকু কলেজের নামে নিয়ে নেওয়া হয় । এভাবে জমি নেওয়ার পরও বোর্ডের নিয়মানুযায়ী ৫ (পাঁচ) একর জমি না হলে কলেজের মঞ্জুরী পাওয়া যাবে না । জমি না হলে মন্ত্রী সাহেবকে কলেজের সরকারী স্বীকৃতির জন্য কিছু বলতেও পারছিনা ।
     
শেষ পর্যন্ত আঃ হাই এর মরহুম মা’র বাপের বাড়ীর সম্পত্তিতে হাত দিতে হলো । খিরাটি দক্ষিণ পাড়ার মরহুম আঃ ছাত্তার মাঝি সাহেবের জমি মামলা করে আঃ হাই এর মা’র নামে নিয়ে পরে কলেজের নামে আঃ হাইদের বাড়ীতে কমিশন এনে রেজেস্ট্রি করে নিয়েছিলাম । এত সব করেও জমি ১৫ (পনের) বিঘা হয় না । পরে কলেজের পশ্চিম পার্শ্বের মরহুম মুজাফফর ভাই এর বোন জামাতার (মুঙ্গুইরা মুন্সী )কাছ থেকে প্রায় ৩ বিঘা জমি কলেজের নামে রেজেস্ট্রি করে নিয়েছিলাম  ।এতসব করতে অনেক কষ্ট, অনেক চাল চালতে হয়েছিল – যা গ্রামের অনেকেই জানেন না ।
আপনারা  হয়ত অনেকেই জানেন কলেজের মাঠে আমার চাচাদের মরহুম হাজী জহিরউদ্দিন বেপারী, মরহুম হাজী জোনাব আলী  ও মরহুম এনায়েত আলী সাহেবদের জমি ছিল ।তাদের অবর্তমানে তাঁদের ছেলেমেয়েরা কলেজের জমি দিতে মোটেই ইচ্ছুক ছিলেন না । পরবর্তীতে তাদের ন্যায্য মূল্য দিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ জমি কলেজের জন্য নিয়েছেন । আরো যারা জমি কলেজের নামে করেছিলেন – তাদের সকলকেই জমির মূল্য বাবদ কিছু না কিছু দেওয়া হয়েছে । তবে আমার বাপ –চাচার প্রদত্ত জমির মূল্য বাবদ কিছুই নিইনি ।
     
জমির দলিলের কাগজপত্র বোর্ড অফিসে জমা দেওয়া হলো । শিক্ষক স্টাফ এভাবে সেভাবে দেখানো হলো । হাতিয়া দিয়ে কলেজ হতে ইংরেজী পড়ানোর জন্য প্রোফেসার আঃ কাদির সাহেবকে পার্টটাইম নিয়োগ দেওয়া হয় ।মনোহরদী  কলেজের সাথে সংগত কারণে ভাব খুব রাখা যায় না ।আশা করি বুঝতে কষ্ট হবে না ।
     
এত গেল জমি, কলেজ স্টাফ – কিন্তু আসল কাজ কলেজ গৃহের বন্দোবস্ত এখনও হয় নাই । এখনও হাই স্কুলের ২/৩ টা রুম এবং গাছ তলায় কলেজের কাজ চালানো হচ্ছে । কলেজ ঘর তৈরির জন্য দেওয়া হল এক বিরাট পরিকল্পনা । স্কুল মাঠের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর দক্ষিনে  লম্বা লম্বি ভাবে ৩০০/৫০০ হাত লম্বা একখানা ঘর তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে স্কুলের ছাত্র, কিছু উৎসাহী শিক্ষক এবং গ্রামের ছাত্র সকলকে নিয়ে কাঠ, বাঁশ সংগ্রহের অভিযানে নেমে পড়লাম । কলেজের জন্য নিবেদিত প্রান আঃ আউয়াল সাহেবের বাড়ীতে একটি শতবর্ষের পুরাতন আম গাছ  ছিল ।কলেজের জন্য কেটে ফেলা হল । আমাদের বাড়ী হতে শুরু করে প্রায় সকলের বাড়ীর রয়না গাছ কাটা হতে বাদ দিইনি । দক্ষিণ পাড়ার সিদ্দিক মিঞাদের বাড়ীতে একটি অতি পুরাতন তাল গাছ ছিল । কলেজের রুয়ার জন্য নিয়ে আসা হলো । পশ্চিম পাড়ার সূতীর পারের রহমানদের বাড়ীর একটি তাল গাছ কেটে আনা হলো । আরও অনেকের অনেক গাছ কেটে নিয়ে এসেছি ।আপনারা শুনলে অবাক হবেন – আমি সকালে হাত করাত ওয়ালা ২ জন করাতি নিয়ে কাঠের সন্ধানে বের হতাম ।এর মধ্যে একটি ঘটনা মনে পড়ল । মরহুম মাওলানা আঃ রশিদ সাহবের বাড়ীর সুফির বাপের একটি রয়না গাছ কাটাতে গেলে বাধা প্রাপ্ত হই । চাঁন মিঞার বাবা  মরহুম হাজী সাহাবুদ্দিন সাহেবকে তারা ধরলেন যেন গাছ কাটা না হয় । গাছটি নাকি ৭০/= টাকা দাম উঠেছে ইত্যাদি --------- । কিন্তু হাজী সাহাবুদ্দিন সাহেব আমাকে গাছ না কাটার অনুরোধ করে চলে যাবার পর আমি করাতি দিয়ে গাছ কেটে ফেললাম । বিরাট গাছ হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল ।গাছ ওয়ালা দৌড়ে এসে – দূর থেকে বললেন – আমি যেন গাছের লাকড়ী ইত্যাদি না নেই ।আমরা শুধু গাছের গোঁড়াটুকু নিয়েই চলে এসেছি ।আমাদের গ্রামে একটা ত্রাস ছিলাম আমি ।আমাকে দেখলেই বলতেন –“এই সারছেরে গাছ বুঝি আর থাকল না”এই যে সকলের নিরব সহযোগিতা যা না হলে এত বড় একটা ঘর করতে পারতাম না । মহান আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা যারা এই কলেজের জন্য এত আত্মত্যাগ করেছেন – তাঁদের যেন বেহেশত নসীব হয় ।
     
কথায় কথায় আরও একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল ।একদিন মোল্লা বাড়ীর পূর্ব পাশের বাগানের ভিতর একটি তালগাছ কেটে ফেললাম ।সাথে ছিলেন জনাব আলহাজ্ব এম. এ হামিদ বি. টি. সাহেব । গাছের মালিক দৌড়ে আসলেন ।আমাদেরই লোক জনাব আঃ আওয়াল ও ডাঃ আঃ রউফ আকন্দ ।তারা গাছ দিতে মোটেই রাজী নন ।আমি অনেক অনুনয় বিনয় করে বললাম  -আপনারা যদি গাছ না দেন তাহলে আর কাউ গাছ দিবে না । অনেক তর্কাতর্কির পর বি. টি সাহেব বললেন – “কাদির গাছ দিয়ে দাও ”আমি চলে আসার সময় শুধু বলে এসেছিলাম – “ভাইসাব শত শত গাছ যোগাড় করেছি – কিন্তু কেউ কোনদিন এভাবে নিয়ে যায়নি ” ।আপনাকে নিয়ে যদি কাঠ সংগ্রহে বের হতাম তা’হলে কলেজ ঘর হতো না ।বি. টি সাহেব শুধু হাসলেন । ডাঃ ছানাউল্লাহ সাহেবের মরহুম পিতার সাথে কাটা গাছ নিয়ে একদিন আমার ধস্তাধস্তি হয়েছিল । তবে গাছ দিয়েছিলেন ।
     
কলেজের বাঁশ সংগ্রহের জন্য সুদূরে সিংগুয়া পর্যন্ত গিয়েছি । সিংগুয়া কয়ার বাড়ীর খালের টানের বাড়ীতে বাঁশ কাটতে গিয়ে আমার এক ছেলের হাত বেশ খানিকটা কেটে যায় । এ জন্যই এসব কথা মনে পড়ে ।
      
কলেজের কাঠের জন্য স্থানে স্থানে করাতি লাগানো হলো কাঠ প্রায় রেডি । এখন অল্প টাকায় মিস্ত্রী জোগাড় করা দরকার ।আমার চাচাত ভাই ভাল কাঠ মিস্ত্রী আরমান মিঞাকে সকলে মিলে ধরলাম । সে তার দলবল নিয়ে রাজী হলো ।৩৫০ হাত ঘর । চারটি ভাগে ভাগ করে কাঠের ফ্রেম তৈরি করে ফেললো । এখন বাঁশের খুঁটির সাথে কিছু কাঠের খুঁটি না হলে চলে না ।কথায় পাই কাঠের খুঁটি ।আমার শ্রদ্ধেয় ভাই আলহাজ্ব মোঃ দানেশ সাহেবের ঘরের জন্য ১৬ টি  খুঁটি পুকুরে ডোবানো ছিল । ছেলে পেলে লাগিয়ে সেগুলো নিয়ে আসা হলো । সে সময় দানেশ ভাই সাহেব বাড়ী ছিলেন না । কাজেই মরহুম ইউনুস ভাই সাহেব এসে বাধা দিলেন । কিন্তু বাধা  দেয়ার আগেই গাছ কাঠের খুঁটি হয়ে মাটিতে পুঁতে গেছে । সে দিন বাজারের দিন ছিল । বাজারের সব মানুষের সাহায্যে সব ঘর উপরে উঠানো হলো ।
     
ঘরের চালা তো উপরে উঠানো হলো কিন্তু এখন টিন কোথায় পাইটিনের ছাওনি দিতে হবে অবশ্যই ।............... প্রত্যেক সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় দেওয়া হয় শুনেছি । এবং আরও শুনেছি যে, কাপাসিয়াতে আমাদের জনাব ফকির সাহাবুদ্দিন সাহেবের মাধ্যমে টিন দেওয়া হচ্ছে । দৌড়িয়ে কাপাসিয়া গেলাম দিনের আশায় । ফকির সাহেবকে পেলাম কিন্তু টিন পেলাম না । তিনি বললেন –“তোমাকে কোথায় টিন দিব – এলাকার মসজিদ মাদ্রাসার জন্যও টিন দিতে পারছি না  – কি আঙ্কেল তোমার ?” ঘরের ছাউনির অভাবে কাঠ ফেরে চৌচির হয়ে যাচ্ছে । কাপাসিয়াতে টিনের কোন ব্যবস্থা না হওয়াতে পাগলের মত ঢাকা ছুটে গেলাম ।ঢাকায় পৌছাতে প্রায় ২ টা বেজে গেল ।মন্ত্রী সাহেবের অফিসের নিচে পৌঁছেছি তিনি তখন সবে মাত্র তার দফতর থেকে লিফটে নেমে গাড়ীতে উঠতে যাচ্ছিলেন । আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন কি খবর ।আমি খিরাটি থেকে শুরু করে কাপাসিয়ার সব ঘটনা খুলে বললাম – শুনে তিনি বললেন ,- “পাগলরে আমার, কলেজ কলেজ করে শেষ হয়ে যাবিরে । আগামিকাল ১০ টার মধ্যে আমার অফিসে এসো দেখা যাক তোমার জন্য কিছু করা যায় কি না ।”  বলেই তিনি চলে গেলেন ।ঐ দিন রাত আর শেষ হয় না । পরদিন ১০ টা বাজার আগেই মন্ত্রী মহাদয়ের অফিসে গিয়ে হাজির ।মন্ত্রী সাহেব বললেন –“একটু হাতের কাজটা সেরে নিই” । ১০ টা ১৫ মিনিট পর তিনি ফোনে  কথা বলতে লাগলেন আমি শুনছি । তিনি বলছেন –“ভাই সাহেব বড় বিপদে আছি ।আমার ২টা  কলেজ ১টা থানা হেড কোয়াটারে – যার কোন বোডিং হাউস নেই । আর একটা থানা থেকে অনেক দূরে ।ওটার কোন ঘরই নেই ।ঐ কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব আমার সামনে বসা ।” – এ সব কথা বলার পর তিনি কি কি শুনলেন পরে বললেন – “তকে পাঠিয়ে দেব এক্ষুনি ঠিক আছে – খুব খুশি হব – আচ্ছা” এই বলে ফোন রেখে আমাকে বললেন – “ঐ উত্তরের ৯ তলার বিল্ডিং এর ২য় তলায় রিলিফ মিনিস্টার কামরুজ্জামান সাহেবের অফিস চেন – এখনই যাও – ওনার সঙ্গে দেখা কর ।দেখ কি করেন তিনি  ।” বলেই মন্ত্রী সাহেব পিয়নকে ডেকে এনে আমাকে তার সঙ্গে দিয়ে বললেন –“যাও প্রিন্সিপাল সাহেবকে মন্ত্রী সাহেবের অফিসে দিয়ে এস ।”
     
পিয়ন আমাকে রিলিফ মন্ত্রী সাহেবের অফিসে পোঁছে দিয়ে চলে গেল । আমি বসে রইলাম পি. এস সাহেবের রুমে ।তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কি চাই ? । আমি বলছি মন্ত্রী সাহেবের সাথে দেখা করব । কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি ।অনেক্ষন কেটে গেল । রিলিফ মিনিস্টার সাহেব আমাদের অর্থমন্ত্রী সাহেবের সাথে হয়ত ফোনে আমার কথা জেনে নিয়ে নিজেই উঠে পি. এস. এর রুমে এসে আমাকে দেখেন, আমাকে যেতে দেয়া হয়নি কেন বলে পি. এস. এর উপরে রেগে গেলেন ।
     
যাক, মন্ত্রী সাহেবের কাছে নিয়ে আমাকে বসালেন । তিনি আমাকে বললেন, -“স্যার আমি আপনার জন্য কি করতে পারি ?” সত্যি আমি মুগ্ধ হলাম মন্ত্রী মহোদয়ের ব্যবহার দেখে । তাঁকে আমি সব খুলে বললাম ।তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর একজন পি. এস কে ডেকে এনে একজন  ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে আনতে বললেন । ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমার কাছে শুনলেন – ৩৫০ হাত ঘরের ঢেউ টিনের প্রয়োজন ।তিনি বললেন – ৫০ বান্ডেল টিন দরকার ।তখন মন্ত্রী সাহেব আমাকে বললেন, ৫০ বান্ডেল টিন আপনাকে দেওয়া গেল, আমি বললাম, “স্যার ঘরের বেড়া সহ দিয়েছেন তো ? মন্ত্রী সাহেব বললেন, না – শুধু ছাউনির জন্য ।” তখন আমি বললাম স্যার বেড়া দেব কি দিয়ে ? মন্ত্রী বললেন, - “মলি বাঁশের বেড়া দিয়ে দেবেন ।” আমি বললাম  - “স্যার  আমাদের ভাওয়ালের লাল মাটি ২/১ মাসের মধ্যে উইপোকায় খেয়ে ফেলবে ।” মন্ত্রী মহোদয়  একটু চিন্তা করে বললেন ,তা  হলে আরও ১০ বান্ডিল দিয়ে দিই ?” আমি ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, “দেন স্যার”। মন্ত্রী মহোদয় ১ জন সেকশন অফিসারকে ডেকে বলে দিলেন এক্ষুনি চিঠি তৈরি করে এস-ডি ও নর্থ ঢাকা ও প্রিন্সিপাল বঙ্গতাজ কলেজ খিরাটিকে হাতে হাতে দিয়ে দেওয়া হউক । চিঠি রেডি করতে প্রায় ১ টা- দেড়টা বেজে গেল । আমি চিঠি নিয়ে এস –ডি ও সাহেবের অফিসে –অফিসে ছুটি হইবার আগেই হাজির হই ।এস –ডি –ও সাহেবের অফিস থেকে নারায়নগঞ্জ সি –এস –ডি গোডাউনকে চিঠি দিয়ে আমাকে হাতে হাতে দিয়ে দিলেন । আমি চিঠি পেয়ে শুধু এক দৌড়ে আকেবারে নারায়ণগঞ্জ সি –এস –ডি গোডাউন এ পৌছাই ।তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছেগোডাউনের অফিসার শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে মদনগঞ্জে অফিস কোয়াটারে থাকেন ।তিনি অনেক আগেই বাসায় চলে গেছেন । আমি ফেরি দিয়ে নদী পাড় হয়ে ওপাড়ে গেলাম । মাগরিবের নামাজ পড়ে সাহেবের বাসায় গেলাম চিঠি দিলাম । আমার পরিচয় দিলে তিনি আমাকে খুব খাতির করলেন ।তাঁকে আমি বললাম “স্যার আমাকে আপনার মনের মত টিন দিবেন । শুধু রিলিফের টিন দিবেন না।। 

মোটেই চিন্তা করি নাই যে যা পারছে টা দিয়েই ভর্তি করে নিয়েছি । ৪০০ শত ছাত্র/ছাত্রী ভর্তি করা চাট্টিখানি কথা নয় । ছাত্র/ছাত্রীদের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছিলাম ওগুলি সব তাদের নাম রেজিস্ট্রেশান  করতেই লেগেছে । এই বেহিসেবী ভর্তির টাকা এবং তাদের নাম রেজিস্ট্রি ও বোর্ডের খরচ মেটানো টাকার হিসাব মেলাতে গিয়েই আমার জীবনে কাল করে দাঁড়িয়েছিল ।  পরবর্তী পর্যায় ৫০/৬০ হাজার টাকা চুরির অপবাদ নিয়ে নিজ গ্রামে নিজের হাতে গড়া কলেজ থেকে বিনা অপরাধে শুধু গুটি কতক পরশ্রীকাতর মানুষের যুক্তিহীন কথায় আমাকে কলেজ ছেড়ে আসতে হয়েছিল । গ্রামের একজন মুরুব্বীকে এ ব্যাপারে আমি ঢাকা এসে ডাঃ ছানাউল্লাহ সাহেবকে খুলে বলার পর তিনি শুধু একটা ছোট্ট পত্র লিখে দিয়েছিলেন – “মামা কাদিরের ব্যাপারে এতটুকু করা ঠিক হয় নি ।”
     
যাক ওসব অনেক কথা – সব লিখলে বিরাট উপন্যাস হয়ে যাবে । আমার শুধু একটি কথাই মনে পড়ে । খিরাটিতে আমার কলেজ করাটা অন্যায় হয়েছিল কিনা । কারণ আমি জীবনে  ২ টা হাইস্কুল ৭টা কলেজ করেছি । কোথাও ৭ টাকা চুরি করার সুযোগ পাইনি, শুধু খিরাটিতেই এ সুযোগ ছিল ।১৯৭২ ইং সন থেকে ১৯৮২ ইং সন পর্যন্ত দীর্ঘ ১০টি বছর আমাকে কত বেতন দেওয়া হয়েছিল – এ খবরটি কেউ কোনদিন নেয়নি ।আমি খিরাটি হতে চলে আসার পর  কলেজের কোন এক সমাবেশে গ্রামের কোন এক উৎসাহী লোক আমাদের গ্রামের ডাঃ আবুল হাসান সাহেবকে কথার মাঝে বলেছিল কাদের প্রিন্সিপাল এতগুলো টাকা কলেজ থেকে মেরে দিয়েছে কেমন হল ? – তখন ডঃ আবুল হাসান বলেছিলেন” “ বেশিদিন তো হয়নি এখনি আপনাদেরকে ৬০ লক্ষ টাকা দেওয়া হলে এমন একটা কাজ কলেজ করতে পারবেন তো ?” একথা শুনে সেই লোক চুপ মেরে গেল এর মুখ খুলল না । শুধু তাই নয়, আমি খিরাটির কিছু লোকের কাছ থেকে পেয়েছি তাঁর চেয়ে বেশি অনেক বেশি সম্মান পেয়েছি পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে । ১৯৯৬ সালে খিরাটি স্কুল মাঠে এক ফুটবল টুর্নামেন্ট ফাইনাল খেলায় (যে টুর্নামেন্টের কমিটির সভাপতি ছিল আমার ভাতিজা জামাল উদ্দিন আহমেদ) আমাকে প্রধান অতিথি করে নিয়ে আসা হয় । এসে দেখি সেখানে আমার কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন কিছু সৈনিক যেমন চান মিয়া, নুরুল ইসলাম, ছানাউল্লাহ, ছিদ্দিক, মনি মিয়া, মাহতাব সহ আরও অনেকে আমাকে স্বাগত জানানোর  নানাবিধ ব্যবস্থা করেছেন । তাদের নেতৃত্বে আমার বাড়ী থেকে মাঠের মঞ্চ পর্যন্ত বিশাল মিছিল সহকারে আমাকে মঞ্চে নিয়ে যায় ।আমি আবেগে আপ্লুত হলাম । আবারও মনে হল খিরাটিবাসির কত উঁচু মনের অধিকারী । তারা সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দিতে জানে ।   
যাক দক্ষিণ পাড়ার জনাব শুক্কুর আলী মেম্বার, পাহলোয়ান, কে কে জীবিত আছেন জানি না তাঁরা থাকলে বলতে পারতেন আমার খিরাটি জীবনের দৈনিক জীবন-যাত্রা সম্পর্কে চর খিরাটি ৪/৫ বিঘা ধানের জমির বদৌলতে আমার বাড়ীতে কলেজের দুই দুই জন প্রফেসর মাসকে মাস রাখা অবশ্য কষ্টই হয়েছিল তখন নতুন অবস্থায় সরকারী কোন অনুদান পাওয়া যেত না পরবর্তীতে কলেজে অধ্যাপকের জন্য মেস করার ব্যবস্থা করেছিলাম তবুও ২ জন প্রফেসর ফরিদপুরের ফজলুল হক ও রাজশাহীর একজন আমার বাড়ীতে বেশ কিছুদিন ছিলেন কত কষ্ট করে টুল-টেবিল চেয়ার-আলমারি তৈরি করে চার পাঁচশত ছেলে-মেয়েদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল মঞ্জুরি আনতে ঢাকা আর খিরাটি দৌড়াদৌড়ি করতে করতে প্রাণান্তকর অবস্থা হয়েছিল এতে আমার জীবনের গতিই পরিবর্তন হয়েছিল অভিজ্ঞতা কাকে বলে বিশেষ করে তিক্ত অভিজ্ঞতা অনেক অর্জন হয়েছিল
     
এইচ.এস.সি পরীক্ষার কেন্দ্র আনার ব্যাপারে কত যে কষ্ট করতে হয়েছিল টা আমার জীবনে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থানা হেডকোয়াটার ছাড়া কোন পরীক্ষা কেন্দ্র দেয়ার নিয়ম ছিল না তবুও মন্ত্রীর নামে কলেজ বলে কথা তারপর মনোহরদী কেন্দ্রের একগুঁয়েমির কারণে প্রথম দিনের পরীক্ষা ১০টার পরিবর্তে ২টায় দিতে হয়েছিল সেই মনোহরদী কেন্দ্রে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সে কি কান্না জানিনা কেন ছেলে-মেয়েরা বিমর্ষ হয়েছিল হয়তো ভীতের কারণে, নানা প্রকার তিরস্কার মূলক কথায় আজ আমার একটা কথা মনে পড়ে মরহুম বি. টি সাহেব আমাকে বলেছিলেন, “কাদের যদি তুমি আগামী দিনের পরীক্ষার আগে খিরাটিটে কলেজ কেন্দ্র আনতে না পার তবে তুমি কিসের প্রিন্সিপাল ? ” বললাম, “ভাই সাহেব, আপনি দোয়া করবেন, আমি যেন পরীক্ষার আগে কেন্দ্র নিয়েই বাড়ী ফিরতে পারি পরদিন শুক্রবার ঢাকা চলে এলাম শনিবার মাত্র ১ দিন অফিস খোলা ঐ দিন মন্ত্রী সাহেব ঢাকা ছিলেন না এস.ডিও সাহেবের পেশকারের কথায় মন্ত্রী সাহেবকে ফোনে বললামভাই সাহেব দয়া করে A.D.C সাহেবকে বলে দিন আমার কথা তখন মন্ত্রী সাহেব বললেন, “আরে কাদির, তুমি আমাকে আর কোথায় নামাবে তুমি এক্ষণই নারায়ণগঞ্জ এস.ডি.  সাহেবের সাথে দেখা কর সে মতে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে রাত ৮টায় পৌঁছি নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে দেখি এস.ডি.ও সাহেব আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন ।এস.ডি.ও সাহেবকে দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রের আদেশ নিয়ে রাত ৯টার সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে রওয়ানা দিয়ে  হাতিরদিয়া রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার সাহেবের চিঠি এবং মনোহরদী কলেজের প্রিন্সিপালের চিঠি রাতেই পৌঁছে দিয়ে আসি কারণ সকাল ১০ টায় পরীক্ষা পরদিন সকাল ১০টার আগেই মনোহরদী কলেজের অধ্যক্ষ সাথে প্রশ্নপত্র, পুলিশ বাহিনী এবং হাতিরদিয়া থেকে রক্ষীবাহিনী সবাই এসে হাজির এবং যথারীতি আমার বঙ্গতাজ কলেজের পরীক্ষা শুরু হয় কলেজ কেন্দ্রের ইনচার্জ ছিলেন মনোহরনী সাব রেজিস্ট্রার সাহেব এই কস্তটা তাঁরা আমাকে না দিলেও পারত কিন্তু তাঁরা থানা হেডকোয়াটার, বড় কলেজ্র দাবিদার, যাক আল্লাহর রহমতে আমিও কম গেলাম কই ? এই তো গেল পরীক্ষার কথা
     
কলেজের কোন ভাল আলমারি নেই ঢাকার ইংলিশ রোডের ইউনুস মার্কেট এর ভদ্রলোককে ধরে ২টা স্টিলের আলমারি যোগাড় করলাম নতুন স্বাধীন দেশ ভারত সরকার কিছু বই কলেজের লাইব্রেরীর জন্য অনুদান হিসেবে দিলেন সেগুলো চিটাগাং থেকে আনতে হয়েছিল এক রোজার বন্ধের  সময় উইপোকা অনেকগুলি বই নষ্ট করে ফেলেছিল
     
এতসব চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ধীরে ধীরে কলেজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এর মধ্যে দুষ্টক্ষতের মত একজন অধ্যাপককে আমার এক ভাগ্নে পশ্চিম পাড়ার নান্নু মিয়াকে (বোরহান  উদ্দিন) কলেজের জন্য নিয়ে আসে কলেজের অধ্যাপক কম থাকায় নিয়ে নিলাম   ওই ভদ্রলোক ডিগ্রীতে, অনার্স-মাস্টার্স ছিলেন না তখন ডিজি থেকে একটা সার্কুলার এলো যাদের ডিগ্রীতে অনার্স নেই তাঁরা যে কলেজে আছেন সেখান থেকে অন্য কোথাও গেলে কলেজে অধ্যাপনা করতে পারবেন না সেই জন্য ওনাকে স্থায়ী ভাবেই থাকতে দিলাম ইতিমধ্যে ভাওয়ালের দিকের ওসমান নামে এম.এ পাশ এক ভদ্রলোক ও সালদৈ গ্রামের ডাঃ ছানাউল্লাহ সাহেবের আত্মীয় পরিচয় একজনকে কলেজে যোগদান করতে দিলাম ।  
     
যারা পরবর্তীতে আমার বড় ভাই শিক্ষক মরহুম বি.টি সাহেব এবং মরহুম ইউনুস ভাই সাহেবকে নিয়ে কলেজের একতরফা হিসাব নিয়ে বললেন তুমি এতটাকা কলেজ থেকে নিয়েছ ।এসব কথা শুনে আমার মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা হলো ।আমি হঠাৎ করে উনাদেরকে বলে ফেললাম ৩ মাসের ছুটি চাই – আমার শরীর ভাল না চিকিৎসা করতে হবে ।তখন তাঁরা মনে মনে বেশ রেগে গেলেন – এবং মনোহরদী থেকে রেভিনিও স্ট্যাম্প এনে আমার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন এবং মরহুম ইউনুস ভাই সাবে বলেই ফেললেন, যাওনা ঢাকা, প্রিন্সিপালি পাবানা । নিজের হাতে গড়া কলেজের মুচলেকা দিয়ে থাকার পাত্র আমি নই ।
    
আপনারা শুনে অবাক হবেন আমি ঢাকায় আসার পরদিনই শহীদ স্মরণিকা কলেজের অধ্যক্ষ সাহেব আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “ভাই সাহেব আমার দায়িত্ব নেন, আমি এর পারছিনা ।” ঐ ভদ্রলোক বয়স্ক ও অসুস্থ ছিলেন ।কাজেই চাকরি –বাকরী আল্লাহর ইচ্ছা । আমি যে  বারবার ৭টি কলেজ করেছি বলে আসছি ঐগুলো হলো জামালপুর ডিগ্রি কলেজ, বঙ্গতাজ কলেজ, কেরানিগঞ্জ মহিলা কলেজ, পলাশ শিল্পাঞ্চল কলেজ, শাহজাহানপুর কলেজ এবং গোড়ান আদর্শ মহিলা কলেজ ।
খিরাটি হতে চলে আসার পরও আমি ৫/৬ মাস পর্যন্ত কলেজের সমস্ত কাজ করে দিয়েছি – অডিট করে দিয়েছি যাতে কলেজটি টিকে থাকে ।কারণ এত কষ্টের করা কলেজ – তখন মন্ত্রী সাহেবও নাই –যে কোন মুহূর্তে কলেজটি বন্ধ হয়ে যেতে পাড়ে । বহু কলেজ আসে এভাবে Defunct  হয়ে গেছে । তবে নজরুল প্রফেসর কে খুব কষ্ট সত্ত্বেও ধন্যবাদ দেই এ কারণে যে তিনি আমার কলেজটিকে টিকিয়ে রাখতে অনেক কষ্ট করেছেন ।তিনি অনুমান করুক আমরা খিরাটিবাসী অনেক উদার, বাংলাদেশের যে কোন স্থানের মানুষের চেয়ে উন্নত চরিত্রের ।

বাংলা সনের ইতিবৃত্ত || রাহাত মাহমুদ পলিন

বাংলা সনের ইতিবৃত্ত

বাংলা পঞ্জিকা হঠাৎ করে বা এমনি এমনি আসেনি। যার ইতিহাস নিচে তুলে ধরেছেন-
রাহাত মাহমুদ পলিন
লেখক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, কলামিস্ট, বি. এসসি প্রকৌশলী (অধ্যয়নরত)
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।

জেনে নিন বাংলা সনের ইতিহবৃত্ত